আমি একটি প্রশিক্ষন কর্মশালায় ক্লাস করছিলাম। মোবাইল এর রিংটোন বন্ধ করা, নোটিফিকেশনের হালকা আওয়াজ শুনে ফোন হাতে নিয়ে দেখি এস এম এস, ওপেন করে দেখলাম, মৃত্যু সংবাদ! আমার খুব কাছের এক জুনিয়র বন্ধুর বাবা মারা গেছেন হঠাৎ করেই। ৬ দিন আগে শুনেছিলাম আমার বন্ধুর বড় ভাইয়ের বিয়ে। ওর বাবা অসুস্থ ছিল জানতাম না তো! কর্মশালা শেষ করে বেরিয়ে ফোন দিয়ে শুনলাম- সন্ধ্যা হতেই নাকি বলছিলেন এ্যাসিডিটি হচ্ছে। রাতে ভাতও খান নাই, ৯/১০ টার দিকে নাকি এক গ্লাস দুধ খেয়েছিলেন এই যা। রাতে ১১/১১:৩০ টার দিকে ঘুমাতে গেলেন। এর মাঝে গ্যাসট্রিকের ঔষধও খাওয়া শেষ। ঘুমাবার ঘন্টাখানেক পর ঘুম থেকে ডেকে তুলেন খালাম্মাকে- বললেন খারাপ লাগছে, কেমন যেন লাগছে। খালাম্মা ইনো গুলে দিলেন। খেয়ে আবার শুয়ে পড়লেন । কিছুক্ষন পর আবার খালাম্মা ডেকে তুললেন- বললেন খুব অস্থির লাগছে বাতাস করতে- এর মধ্যে ফজরের সময় হয়েছে। ফজরের কিছু পর শ্বাস ঘন ঘন পড়তে লাগলো মানে শ্বাস কষ্ট শুরুর মুহুর্তের মধ্যেই কিছু করার আগেই চলে গেছেন । কথা বলে জানলাম ৬ মাস আগে চেকআপ করেছিলেন তেমন কোন সমস্যা পাওয়া যায়নি। যথাবিহিত ডায়াবেটিস, বাকি সব ঠিক ছিল। তার ডায়াবেটিস ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করতেন না । তবে ধূমপানের বদঅভ্যাস ছিল। খালাম্মা জানালেন বুক ব্যথা হচ্ছে এমনটি বলেন নাই। বুকে চাপ চাপ অনুভব করছিলেন আর ছিল অস্থিরতা। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার পর মৃত ঘোষনা করলেন, কারণ কার্ডিয়াক অ্যারেষ্ট।
এতে অনেক সময় রোগী বুকের ব্যথা অনুভব করেন না কিন্তু এ্যাটাক ঠিকই হয়। ডাক্তারদের মতে, যাদের ডায়াবেটিস আছে সে সাথে মাত্রারিক্ত ধূমপানের অভ্যাস হার্ট এ্যাটাকের কারণ হতে পারে। খালুর মাত্রাতিরিক্ত ধূমপানের অভ্যাস ছিল। খুব যে বয়স হয়েছিল তা নয়। বড় সন্তানের বয়স বর্তমানে ৪১ বছর।
দেশে হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। চিকিৎসার উন্নয়নও হচ্ছে আবার রোগের জটিলতাও বাড়ছে ক্রমশই বিশেষ করে হৃদরোগ সম্পর্কিত। ৫০-৬০ ঊর্ধ্ব মানুষের মধ্যে আজকাল হার্টের ব্লক সহ অন্যান্য রোগের আশংকা বেড়েই যাচ্ছে। তবে আমাদের মধ্যে অনেকেই হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণসমূহ জানেনা কিংবা জানেন না ঐ মুহুর্তে কি করতে হয়।
স্বাস্থ্য বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন “আমার স্বাস্থ্য” কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে হার্ট অ্যাটাক কেন হয় প্রশ্নের উত্তরে ৩৬% মানুষ বলেছেন এর কারণ, উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তের কোলেস্টেরল। আবার ২২% মনে করেন বুকের ব্যাথা ও অতিরিক্ত চিন্তার কারণেই হার্ট অ্যাটাক হয়। ১২% মনে করে অতিমাত্রা ঔষধ সেবনের কারণে, আর ৩০% মনে করেন হার্ট অ্যাটাকের জন্য উপরের সব কয়টি কারণই দায়ী। এক্ষেত্রে সচেতনতা খুবই জরুরী। হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে অন্যতম বিষয় হলো রক্তে কোলেস্টেরল এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখা। কিন্তু কিভাবে ?
এ প্রশ্নের উত্তরে ৩৪% মানুষ বলেছেন দৈনিক হালকা ব্যায়াম, জোরে হাঁটা বা দৌড়ানো কমপক্ষে আধা ঘণ্টা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, র্বি জাতীয় খাদ্য পরিহার এবং আঁশ সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ ও শাকসবজি খাওয়া, আবার ২৮% মানুষ বলেছেন ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। ১০% বলেছেন খাদ্যে লবণের পরিমান কমানো আর ৩১% মানুষ মনে করে রক্তের কোলেস্টেরল এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ রাখতে সত্যিকার অর্থে এসবই করা জরুরী। কারণ সব কোলেস্টেরলই শরীরের জন্য খারাপ এমন নয়। যেমন জরিপকৃত ৪১% মানুষবলেছেন এই . ডি.এল. কোলেস্টেরল, HDL(high density lipoprotein) এটি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায় আর ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হলো LDL(low density lipoprotein)। তাই আমাদের উি ত রক্তে HDL এর পরিমাণ বাড়াবার চেষ্টা করা। ২৮% মানুষ বলেছেন, শারীরিক পরিশ্রম বাড়ালে বা নিয়মিত ব্যায়াম করলে রক্তে HDL বাড়ে । আবার ৩৬% মানুষ বলেছেন, খাবারের সাথে পরিমাণমতো মনো-আনস্যা ুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ এবং স্যা ুরেটেড ফ্যাট পরিহার করলে রক্তে ঐউখ বাড়ে। তার মানে সব ধরণের ফ্যাটই যে খারাপ এমন নয়। যেমন - জরিপকৃত ৫০০ জন ব্যক্তির মধ্যে ৩৩% মানুষ বলেছেন মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরের জন্য কম ক্ষতিকর। আবার ১৯% মানুষ বলেছেন ট্রান্স ফ্যাট শরীরের জন্য কম ক্ষতিকর, আর ২০% মানুষ বলেছেন স্যাচুরটেড ফ্যাট শরীরের জন্য কম ক্ষতিকর।
তবে এর আগে জানা দরকার কেন হৃদরোগ হয় ? এ প্রশ্নের উত্তরে ২৩% মানুষ বলেছেন উচ্চ রক্তচাপের কারণে হতে পারে, আবার ২৯% মানুষ বলেছেন রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে হতে পারে, আর ১০% মানুষ বলেছেন স্থ‚লতা, কম শারীরিক পরিশ্রম কারণে, এবং ৩৮% মানুষের ধারণা ডায়াবেটিস, হৃদরোগের কারণ এবং উপরের সব কয়টি কারণেই এ রোগ হতে পারে ।
সত্যি তাই। তবে অনেক সময় কোন পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। ৩০% মানুষ বলেছেন, ডায়াবেটিস রোগীদের স্নায়ু দূর্বল হয়ে পড়ে,ব্যাথা অনুভব কমে যায় হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আবার ৩৩% মানুষ মনে করে, ব্যাথা অনুভব কমে যাওয়া হার্ট অ্যাটাক এর লক্ষণ । মূলত, আমাদের পুরো শরীরে অনবরত রক্ত সরবরাহ করে লেছে হৃৎপিন্ড। রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি পেয়ে বেঁচে থাকে আমাদের শরীরের কোষগুলো। এই হৃৎপিন্ড নিজে পুষ্টি পায় কোথা থেকে? করোনারি আর্টারি নামে হৃৎপিন্ডের গায়ে থাকে দুটি ছোট ধমনী। এরাই হৃৎপিন্ডে পুষ্টির যোগান দেয়। কোন কারণে এই করোনারি আর্টারিতে যদি বøক সৃষ্টি হয় তাহলে যে এলাকা ঐ আর্টারি বা ধমনীর রক্তের পুষ্টি নিয়ে লে সে জায়গার হৃৎপেশি কাজ করে না। তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে। এর কেতাবি নাম মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন। হার্ট অ্যাটাকে বুকে প্র ন্ড ব্যাথা অনুভূত হয়। এই ব্যাথা ২০-৩০ মিনিট স্থায়ী হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী হাসপাতালে পৌঁছার আগেই মৃত্যুবরণ করে।
আবার যেকোন সময় ঘটতে পারে এ দূর্ঘটনা যেমন:
● বিশ্রামের সময় হতে পারে
● হঠাৎ ভারী কায়িক শ্রমের পর হতে পারে
● বাইরে ঠান্ডা আবহাওয়ায় বেরুলেন, তখন হতে পারে
● ইমোশনাল স্ট্রেসের জন্য হতে পারে
● ঘুমের সময় হতে পারে
MI [হার্ট অ্যাটাক] হার্ট অ্যাটাকের কারণ:
● এথেরোসক্লেরোসিস (Atherosclerosis) –সোজা ভাষায় করোনারি আর্টারিতে রক্তে চর্বি জমাট বেঁধে যাওয়া ও ধমনী প্রা ীর মোটা হয়ে সহজে রক্ত প্রবাহে বাধাঁ সৃষ্টি করা। একে সাধারণ ভাষায় ব্লক বলে
থাকি আমরা।
● Thrombus Formation (রক্ত জমাট বেঁধে
দলার মত সৃষ্টি করে)
● Coronary Artery Stenosis (রক্তনালী
সরু হয়ে যায়, ফলে রক্ত প্রবাহ বিঘ্নিত হয়)
Risk Factor:
কিছু কারণ আছে যা হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রণ যোগ্য যেমন বয়স, লিঙ্গ, বংশগত কিন্তু কিছু কারণ আছে যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য যেমন-
● ধূমপান
● উচ্চ রক্তচাপ
● হাইপার লিপিডেমিয়া
● ডায়াবেটিস
● মুটিয়ে যাওয়া
● কায়িক পরিশ্রমের অভাব
● উচ্চ চর্বি জাতীয় খাদ্য গ্রহণ ও আঁশ জাতীয় খাদ্য কম খাওয়া
● মানসিক চাপ
● মদ্যপান
● হাইপো-ইস্ট্রোজেনিমিয়া
● জন্মনিয়ন্ত্রক পিল
সাধারণত ধূমপান এবং উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকির পরিমাণটা বাড়ে। জরিপে ৩৭% মানুষ বলেছেন এর কারণ উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হার্টকে সারা শরীরের রক্ত সরবরাহ করতে অতিরিক্ত কাজ করতে হয় ফলে একসময় হার্ট দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার ২০% মানুষ বলেছেন অনেকে স্ট্রেস এ থাকলে নাকি বেশী ধূমপান করে যা হার্ট এর ক্ষতি সাধন করে, আর ১৮% মানুষ বলেছেন অতিরিক্ত কাজ করতে করতে হার্ট এর মাংস পেশি বড় হয়ে যায় ফলে ক্ষতি সাধন হয়, এবং ২৫% মানুষ বলেছে এক সময় হার্ট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে যার কারণে ক্ষতি সাধন হয়।
এছাড়াও ধূমপানের মাধ্যমে হাতে বা পায়ে এক সময় প ন ধরতে পারে। ৩০% মানুষ বলেছেন ধূমপানের কারণে রক্তনালীর দেয়ালে ক্ষত সৃষ্টি হয় ফলে প ন ধরতে পারে এক সময় এটা তারা জানেন। আবার ২৫% মানুষের ধারণা ধূমপানের কারণে রক্তনালীতে কোলেস্টেরল জমে রক্তনালী প্রদাহের কারণে রক্ত লা ল বন্ধ হয়ে যায় এবং ২০% মানুষ বলেছেন যদি হাতে বা পায়ের রক্তনালীর এরকম সমস্যা হয় তাহলে রক্তের অভাবে হাতে বা পায়ে প ন ধরতে পারে ধূমপান সেবনের মাধ্যমে।
কিভাবে বুঝবেন হার্ট অ্যাটাক?
বুকে প্রচন্ড ব্যাথা হবে। এরকম লাগতে পারেঃ
● হঠাৎ অনুভব করবেন ভারী কিছু একটা যেন চড়ে বসে আছে আপনার বুকের উপর
● বুকের ব্যাথা মনে হবে যেন বুক চিড়ে ফেলছে
● হজম হবে না, পেটের উপরের অংশে জ্বালাপোড়া করবে
● এছাড়াও ছোট ছোট ঘন ঘন শ্বাস প্রশ্বাস ফেলা, ঘেমে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, ঝাঁপসা দেখা, বমি, এসব হতে পারে ।
কি করা উচিত?
হার্ট অ্যাটাক হয়েছে ধরতে পারলে রোগীকে তাৎক্ষনিক এসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাইয়ে দেওয়া ভাল। এতে রক্ত জমাট বাঁধা বন্ধ হবে। জিহবার নিচে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে দিতে হবে। রোগীকে আশ্বস্ত রাখা, দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
হাসপাতালে নেবার পর ডাক্তার নানান ধরণেরচিকিৎসা দিতে পারেন। প্রয়োজন মোতাবেক ডাক্তার মেডিসিন বা সার্জারির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে তা করার জন্য প্রয়োজন হবে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার। অনেক সময় হার্ট এ রিং বসাতে হয়। সাধারণত হার্টের রক্তনালীতে যদি ব্লক থাকে তাহলে রক্ত প্রবাহ বিঘ্নিত হয় বা বাকগ্রস্থ হয় ফলে হার্ট এ রিং বসাতে হয়। অন্যদিকে বাইপাস সার্জারি পরবর্তী জীবন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা আবশ্যক। জরিপে অংশগ্রহণকারী ২১% মানুষ বলেছেন বাইপাস সার্জারির পর ভারী কাজ বা অতিরিক্ত চিন্তা থেকে বিরত থাকতে হয়, আর ৩৪% মানুষ বলেছেন দুশ্চিন্তা, হঠাৎ রেগে যাওয়া ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা উচিত, আবার ২৯% মানুষ বলেছেন ডাক্তার এর সাথে যোগাযোগ রাখা এবং পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, ঔষধ সেবন করা , পরিমাণে সঠিক খাদ্যাভ্যাস নিয়ম-তান্ত্রিক জীবনযাপন করা উচিত।
পরিমিত খাবারের সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ না নেওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণ আর ধূমপান না করায় দৈনন্দিন জীবনে এ কয়টি অভ্যাস আপনার হৃৎপিÐকে রাখবে সুস্থ- সবল। দৈনন্দিন জীবনে নানা কৌশলে আপনি এসব অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন খুব সহজেই। আসুন জেনে নিই হৃৎপিন্ড ভালো রাখার সহজ উপায়:
শারীরিক ব্যায়াম করা:
হৃৎপিন্ড ভালো রাখতে সপ্তাহে ন্যূনতম পাঁচ দিন করে রোজ ৩০ মিনিট ব্যায়ামের প্রয়োজন বড়দের। কিন্তু ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকলে হুট করে শারীরিক কসরতের মাধ্যমে ঘাম ঝরানো ভীষণ ক্লান্তিকর ব্যাপার। এ কারণে বাসায় বাচ্চাকাচ্চা থাকলে তাদের সঙ্গে খেলার মধ্য দিয়ে ব্যায়ামের কাজটা সেরে নিতে পারেন। সেটা হতে পারে কায়িক পরিশ্রমের যেকোনো খেলা। বাচ্চাকাচ্চা না থাকলেও সমস্যা নেই। একটু হাঁটা কিংবা সাংসারিক কাজের মধ্য দিয়ে ব্যায়ামের রুটিন সেরে নিতে পারেন। প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম মানে যে টানা আধাঘণ্টা ব্যায়াম করতে হবে, সেটা কিন্তু নয়। এ সময়টাকে ভেঙে নিতে পারেন। সকালে ১০ মিনিট ঘাম ঝরালেন, দুপুরে অফিসে মধ্যাহ্ন বিরতির সময় ১০ মিনিট হেঁটে খেতে গেলেন, অফিস থেকে ফেরার পর বিকেলে কিংবা রাতে এ রকম আরও কিছু কাজ দিয়ে ব্যায়াম সেরে নিতে পারেন।
খাদ্যাভ্যাস:
আপনি প্রাণীজ উৎস থেকে প্রাপ্ত ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট’ (ক্ষতিকর স্নেহ পদার্থ) খেতে ভালোবাসেন। যেমন ধরুন, ‘রেড মিট’ কিংবা পূর্ণমাত্রায় ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি। হৃৎপিন্ড ভালো রাখতে এসব খাবার ছাড়তে হবে। কিন্তু ছাড়বেন কীভাবে? আপনি তো বদভ্যাসের দাস! ভাববেন না, উপায় আছে। অভ্যাসটা ধীরে ধীরে পাল্টান। ‘রেড মিট’-এর মেন্যুতে ধীরে ধীরে ‘লো-ফ্যাট মিট’ যোগ করুন।
দুগ্ধজাত খাবারের পরিবর্তে জলপাই কিংবা ‘ক্যানোলা অয়েল’ খেতে পারেন। খাবারে লবণের পরিমাণ কমান। প্রক্রিয়াজাত কিংবা প্যাকেটজাত খাবার কম খান। প্রতিদিনের খাবারে ১ হাজার ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি লবণ খাবেন না। ভালো করে রান্না করলে শাকসবজি খেতে কিন্তু দারুণ লাগে। শাকসবজি খান প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কাপ, সঙ্গে থাকুক ফলমুল। শস্যদানা বা ‘গ্রেইন’যুক্ত খাবার খেতে পারেন, যেমন বাদামিচাল, বার্লি, পপকর্ন, ওটমিল, গমের রুটি, গমের প্যানকেক ইত্যাদি।
বিশ্রাম:
দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে পরিমিত বিশ্রাম নিন। মানে, স্রেফ কিছুই করবেন না, কোনো চাপ নেওয়ার দরকার নেই। পূর্ণমাত্রায় বিশ্রাম হৃৎপিন্ডের জন্য উপকারী। যুক্তরাষ্ট্রের ‘একাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়াবেটিস’-এর চিকিৎসক সুসান মুরের ভাষ্য, হৃৎপিন্ডের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় মানসিক চাপ ‘খলনায়ক’-এর ভূমিকা পালন করে। গোটা স্বাস্থ্যের ওপরই এটা মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আর তাই মাঝেমধ্যে কাজ ফেলে উঠে দাঁড়ান। বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করুন। সাংসারিক কিংবা অফিসের কাজ ভুলে যান। স্রেফ নিজের জন্য বিশ্রাম নিন। সেটা শুয়ে- বসে যেকোনোভাবে। বিশ্রাম নেওয়ার পর দেখবেন ভীষণ ফুরফুরে লাগছে। মানে, ওই বিশ্রামের সময়টুকু আপনাকে কাজের জন্য উজ্জীবিত করে তুলবে।
স্থূলকায় মানুষের ওজন নিয়ে দুর্ভাবনার শেষ নেই। ওজন কমাতে ক্যালরির হিসাব করছেন, ব্যায়াম করছেন কিন্তু তারপরও কমছে না কিছুতেই। একটু মাথা খাটান। আপনি কি স্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছেন? স্বাস্থ্যকর খাবার আর ক্যালরিযুক্ত খাবার কিন্তু এক নয়। পুষ্টিকর খাবার খান এবং ক্যালরি খরচ ও গ্রহণে ভারসাম্য আনুন। তরল খাবার খেতে পারেন। শাকসবজি থাকুক প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়। এ ছাড়া শারীরিক পরিশ্রম করুন। প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা বাধ্যতামূলক করুন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। বাসা থেকে বের হয়েই রিকশা না নিয়ে হেঁটে কিছুটা পথ এগোন। বাসায় ফেরার পথেও একই কৌশল অনুসরণ করুন।
ধূমপান:
ধূমপানের অপকারিতা স ^ন্ধে আমরা সবাই জানি। এ বদভ্যাসটি ছাড়ার নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই। যে যার মতো করে ে ষ্টা করে থাকে। ি কিৎসকের পরামর্শ, পরিবারের সাহায্য কিংবা এ দুটি ব্যাপার মিলিয়ে ে ষ্টা করলে সুফল পেতে পারেন। ধূমপানের অপকারী দিকগুলো নিয়ে ভাবুন। এটা ছাড়ার উপকারী দিকগুলোতে মনোযোগী হতে পারেন। ধূমপায়ী বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করাই শ্রেয়। মদ্যপান এড়িয়ে চলুন, এটা ধূমপানে আপনাকে আরও আকৃষ্ট করবে। শরীরচর্চার মধ্যে থাকলে ধূমপানের ইচ্ছা কমে যেতে পারে। কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যে থাকলেও সুফল পেতে পারেন।
ইতিবাচক মনোভাব ও চাপ কমান:
হৃৎপিন্ড ভালো রাখতে মানসিক প্রশান্তির বিকল্প নেই। কিন্তু কর্মক্ষেত্র, সমাজ কিংবা পরিবার থেকে মানুষ নানাভাবে চাপে থাকে। এসব চাপ যেমন মোকাবিলা করতে হবে, তেমনি বুদ্ধি করে কমাতেও হবে। প্রতিদিনের কাজের চাপ শেষে নিজের জন্য আলাদা করে একটু সময় বের করুন। পছন্দের গান শুনতে পারেন কিংবা বই পড়তে পারেন। কোনো কারণে মনে কষ্ট পেলে তা বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগ করে নিন। মনে কষ্ট পুষে রাখবেন না। এ ধরণের অভ্যাস হৃদ্রোগ ডেকে আনে। সবেচেয়ে ভালো হয় পরিবার কিংবা কর্মক্ষেত্রে মৎকার সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ একাকিত্ব বোধ করেন এখনকার মানুষ। অর্থাৎ ১৯৮০ সালে এ হার ছিল ২০ শতাংশ, এখন ৪০ শতাংশ। একাকিত্ব শুধু মানসিক ক্ষতি করে না, শারীরিক ক্ষতিও করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, কেউ যখন কারও সঙ্গে কথা বলে, তখন হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে মস্তিষ্ক হৃৎপিন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। এতে হৃৎপিন্ডের কার্যক্রম দারুণ স ল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ হৃৎপিন্ড ভালো রাখতে মানসিক চাপ কমানো এবং চারপাশের মানুষের সঙ্গে মৎকার সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি।
দূষিত বায়ু এড়িয়ে চলুন:
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে দূষিত বায়ুর পরিমাণ বেড়েছে। আবহাওয়াবিদদের ভাষ্য মতে, শীতকালে সকালের দিকে বাতাসে দূষিত পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে। সাধারণত বাতাসে থাকা অতিরিক্ত ধাতব পদার্থ নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে ধমনির প্রাচীরকে আরো পুরু করে তোলে, যে কারণে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়।
ডিম খান:
যারা বলছেন, বেশি বেশি ডিম খেলে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়ে তাঁদের জন্য দুঃসংবাদ। কেননা ব্রাজিলীয় গবেষকরা জানিয়েছেন, ডিমের কুসুমে থাকা ভিটামিন ই, বি-১২ এবং ফলেট করোনারি আর্টারিকে পরিষ্কার রাখে। তবে কেউ যদি দিনে ারটি করে ডিম খেতে থাকেন, তবে তাঁকে এসব গবেষণার কথা ভুলে যেতে হবে।
শ্বাসের ব্যায়াম করুন:
না, নিজের ইচ্ছামতো গতিতে শ্বাস নিতে কিংবা ছাড়তে বলা হচ্ছে না। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন শ্বাসের ব্যায়াম করুন। উদাহরণ হিসেবে প্রথমে ৩০ সেকেন্ডে ছয়টি পূর্ণাঙ্গ শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পূর্ন করুন। এরপর সময়ের পরিমাণ কমাতে থাকুন। এ ব্যায়াম আপনার হৃদ সংকো ন সংক্রান্ত চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে।
সময়মত ঘুমান:
যাদের অনিদ্রা নামক রাজরোগ আছে, তারা অন্যদের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বেশি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের জন্য প্রতিদিন বেশি বেশি শারীরিক পরিশ্রম করার আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
কম চর্বিযুক্ত খাবার খান:
খাবারে থাকা চর্বি হৃৎপিন্ডকে কার্যকর করে তুলতে ভূমিকা রাখে। সুতরাং খাদ্য তালিকা থেকে নিয়মিতভাবে র্বির পরিমাণ কমাতে থাকুন, তবে অবশ্যই প্রয়োজনীয় পুষ্টি যাতে প্রতিদিন খাদ্যে বরাদ্দ থাকে সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
এনার্জি ড্রিংক্স থেকে বিরত থাকুন:
শক্তিবর্ধক এসব পানীয়কে ‘শত্রু’ হিসেবে গণ্য করুন। কেননা এসব পানীয় কোনোভাবেই আপনার কোনো ধরণের উপকারে আসবে না, উল্টো রক্ত াপ বাড়িয়ে মুহূর্তেই আপনাকে ধসিয়ে দেবে।
গান গান:
হৃৎপিন্ড ভালো রাখতে গলা ছেড়ে গান গাইতেও উৎসাহিত করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, দলবদ্ধ সংগীত কিংবা কারাওকে হাসিখুশি রাখে হৃদযন্ত্রকেও।
সামাজিক যোগাযোগ বাড়ান:
একা বাস করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় বেশি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিতে থাকে। তাই অন্যদের সঙ্গে কথা বলুন, হাত মেলান, জড়িয়ে ধরুন এবং আরো বেশি সামাজিক হতে চেষ্টা করুন; নিজের স্বার্থেই।
যেসব খাবার হার্টের জন্য ভালো:
ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খাবেন। এ ধরণের খাবারে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা হার্ট ভালো রাখার জন্য অন্যতম একটি উপাদান। হলুদ, সবুজ, কমলা, লাল রঙের সবজি ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ। ফলের মধ্যে অ্যাভোকাডো হার্টের জন্য সব থেকে উপকারী। অ্যাভোকাডোতে সব ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। বিশেষ করে অ্যাভোকাডোতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-ই আছে। হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য ভিটামিন-ই খুব ভালো কাজ করে। এছাড়া কমলা, আপেল, কলা, স্ট্রবেরি, আঙুর, লেবু ইত্যাদি ফলে প্রচুর ভিটামিন-সি রয়েছে, যা হার্টের পক্ষে খুব উপকারী।
কী ধরণের খাবার খাবেন:
সবুজ শাকসবজির মধ্যে পালংশাক, ধনিয়াপাতা, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম, কুমড়া, লাউ, ব্রকোলি, গাজর, ভুট্টা, বিট, পেঁয়াজ, মিষ্টিআলু হার্টের জন্য ভালো। প্রোটিন জাতীয় খাবারের মধ্যে সয়াবিন, বাদাম, সূর্যমুখী বা তিলের বীজ, রাজমা, ডাবলি বুট, তৈলাক্ত মাছ খেতে পারেন। বার্লি, জোয়ার, বাজরা, আটার রুটি, ওটস, ব্রাউন রাইস হার্টের জন্য উপকারী। মশলার ভেতর আদা এবং রসুন রান্নায় ব্যবহার করুন। এসব মশলা খাবারে স্যা ুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ ব্যালান্স করে, কোলেস্টেরল কম রাখতে সাহায্য করে।
কী ধরণের খাবার খাবেন না:
ময়দা, চিনি, প্রসেস্ড ফুড, ডিমের কুসুম, লাল মাংস না খেলেই বেশি ভালো। খেলেও পরিমাণে খুবই কম খাবেন। দুগ্ধজাতীয় খাবার কম খাবেন। অ্যালকোহল এড়িয়ে লুন। সিগারেট খাবেন না।
রান্নায় কী ধরণের তেল ব্যবহার করবেন:
মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। বাদাম তেল, অলিভ অয়েল, তিলের তেলে রয়েছে মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড। রান্নায় এই ধরণের তেল ব্যবহার করুন। ভেজিটেবল অয়েল দিয়েও রান্না করতে পারেন। এতে আছে পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট যা হার্টের জন্য ভালো। নারিকেল তেল বা পাম অয়েল রান্নায় ব্যবহার করবেন না।
পরিশেষে
হৃদয়ের খবর রাখা জরুরী সেইসাথে প্রয়োজন যথাযথ যযত্নআত্তিে। সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই। তাই দেরী না করে জেনে নিন আপনার হৃদয় ভালো আছে কিনা। দেশে যেকোন হাসপাতালেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সহজেই জেনে নিতে পারেন আপনার হৃদয়ের খবর এবং সে অনুযায়ী সাবধানতা অবলম্বন করে সুস্থ থাকুন।




.jpg)

.jpg)






