ছোটবেলা হতেই আমার খাবারের অনিয়ম ছিল। চানাচুর আর তেতুঁল ছিল সবচেয়ে প্রিয়। বিদ্যালয়ের পাঠ চুকানো পর্যন্ত টিফিনের সময় চানাচুর বানানো,বাদাম ভাজাই ছিল নিত্যখাবার আর স্কুল হতে ফেরার পথে ৫০ পয়সার তেতুঁলের আচার ছাড়া কি বাসায় ফেরা যায়! বান্ধবীদের সাথে গল্পের আড্ডায় হেটে হেটে বাসায় ফিরতে তেতুঁলই প্রিয় ছিল সবসময়। তেতুঁল খাওয়ার দোষে মা,ভাই-বোনদের অনেক মারও খেয়েছি। তাতে কি আর বদ অভ্যাস ছাড়া যায়! কলেজ সময়টায় সাথে যোগ হলো ঘন দুধের চাএবং টপটি,বড় হবার সাথে সাথে তেতুঁল খাওয়ার অভ্যাসটা কমলেও দিনে ২ থেকে ৩ বার দুধ চা খাওয়া আর বাইরে বেরুলেই টচপটি খাওয়ার অভ্যাসটা গেল বেড়ে। চাকুরীতে ঢুকার পর অভ্যাসটা আরো বাড়লো, বাড়লো টপটি খাওয়াটাও। ২০০১ সাল হতে ২০১১ পর্যন্ত আমার কর্মক্ষেত্র ছিল ঢাকার নিউ ইস্কাটন রোডের ৫২ নং বিল্ডিং (টিএমসি বিল্ডিং) এর চর্তুথ তলায়,বিল্ডিংটির নিচে আজো সে চটপটিওয়ালা আছে। আছে বাদাম বিক্রেতাটাও, ১০ বছরের অফিসে খুব কম দিন গিয়েছে যে অফিস ছুটির পর আমরা ৩ সহকর্মী চটপটি খাই নাই। চটপটিওয়ালাও বুঝে গিয়েছিল আমার পছন্দ ঝালবেশী,তাও আবার শুকনো মরিচ ,ইস ভাবতেই জিবে জল লে আসছে! আহা সেকি স্বাদ! পুরানো দিনগুলো চেনা আনন্দের- ২০১৬ সাল পর্যন্ত অভ্যাসগুলো এমনই ধারায় অব্যাহত ছিল। দুধ চা, চটপটি, চানাচুর আর মূলখাবারে আমার ভর্তাই প্রিয় ছিল। বলতে বাধা নাই গরুর মাংস পছন্দের তালিকায় উপরের দিকেই। তবে সব ছাপিয়ে দুধ চা, সকাল আমার শুরুই হতো না দুধ চা ছাড়া। তাও আবার তেমন না, ঘন দুধের, চলছিল চেনা আগের চটপটি ওয়ালার জায়গায় নতুন কেউ, মৌচাক মার্কেট নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি , রাপা প্লাজার ফুড কোর্ট,বেইলী রোডের রাস্তার পাশ হতে শুরু করে অনেক অভিজাত দোকানের চটপটি দই ফুসকা,আহারে আমার দিন গুলো!
২০১৬ এর শেষের দিকে শুরু বুক জ্ববালা বমি বমি ভাব, পেট ব্যাথা, ও মাগো সে কি কষ্ঠ! আমি বিছানা হতে উঠতে পারছিলাম না, তার সংঙ্গে পরিচিত হবার এই অসুস্থতা মনে করলেও আমি এখন আতঁকে উঠি। তার সংঙ্গে, গ্যাস্ট্রিক জী জি আমাদের সবার খুব পরিচিত, তিনি যাকে পাত্তা দেইনা আমরা,ব্যথা হলেই মোড়ের ফার্মেসী হতে যে কোনো টাইপের ট্যাবলেট বা সিরাপ খেয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করি এবং কমে গেলে ভুলে থাকি।
সেই থেকে তার সাথে আছি গত ৩ বৎসরের মধ্যে সে আমাকে দখল করে নিয়েছে পুরোপুরি, কেননা তাকে, আমি নিয়মের শৃংঙ্খলে আটকাতে পারিনি। ডাক্তারের বারণ সত্ত্বেও চা ছাড়তে পারছিলাম না। দিনে একবার বা দু’বার না খেলে চলছিল না, এমনও হয়েছে দুধ চা খাচ্ছি আবার গ্যাষ্ট্রিকের ব্যথার ভয়ে কাচা আদা চিবুচ্ছি। কত মাসতো সারাক্ষণই আদা খেতাম। গ্যাষ্ট্রিক এত ভালবাসা শুরু করলো আমায় আর আমি তাকে পাত্তাই দিছিলাম না বেশী। সাথে ব্যবসাগত টেনশন প্রতিদিনকার রাত জেগে লেখালেখি, মুটিয়ে যাওয়া; অনিয়ম সবই গ্যাস্ট্রিক কে উৎসাহিত করছিল। আর তিনিই বা সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন! এত্তো সকাল হলো ওরে বাবা! কি কষ্ট আমার তো গলা হতে রক্তক্ষরণই হলো কিছুটা, না আলসার ভায়ার দেখা মেলে নাই কিন্তু সম্ভাবনার লক্ষণ স্পষ্ট, ডাক্তার দুধ, দুধ জাতীয় খাবার এমনকি শক্ত ভাতও নিষেধ করে দিলেন, লাল মরিচ ,চানাচুর, বাদাম নিষেধ, চটপটি তো নাই যা বললাম, ভর্তা, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমারতো পুরোনো অভ্যাস গুলোর সাথে ব্রেকআপের আদেশ হয়ে গেল ভালোবাসার আদেশ এলো ভিলেন রূপী গ্যাস্ট্রিকের সঙ্গে।
গত কিছুদিন ধরে রাতে ঘুমাতে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে। বুক ব্যথা করে, গ্যাসের উর্ধ্বমুখী চাপে আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, উঠে বসে কি, আদা খাই, দুই বা তিনটা গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট খাই, খাটে শুয়ে ব্যায়াম করি, ঢেকুর গলা পর্যন্ত এসে আটকে থাকে খুব বাজে আর কষ্টকর অভিজ্ঞতা, আবার ডাক্তার আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ঔষধের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়া সাথে লাখো কোটি নিষেধাজ্ঞা, বিরহের দিন যে বড় বেদনাময়! গত ক’টাদিন দুধ চা খাচ্ছি না। চানাচুর খাবার মাত্রা কমতে কমতে প্রায় ভুলতে বসেছি তাকে। জানি না এই বিরহবেলা কবে শেষ হবে এ আমার ভালবাসার গল্প জাংক ফুড এবং চায়ের সংগে বিচ্ছেদ, কারন ভিলেন রূপী গ্যাষ্ট্র্রিক। আপনার পরিচয় আছে এই কাবিলা বা মিশা সওদাগরের সাথে ? নাহ বাকি একটু চিনেন, চোখে না দেখে একটু একটু গল্প শুনে আসুন আজ তাকে পুরোটাই জানি, মিত্র না চিনুন শক্রকে তো ভালোভাবে চেনা জরুরী। দেশের স্বাস্থ্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক প্রকাশনা “আমার স্বাস্থ্য” কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে জরিপকৃত ৩০০ জন মানুষের মধ্যে ৯৯% ভাগ মানুষই গ্যাষ্ট্র্রিক যে একটি রোগ এ কথাটা জানেন। কিন্তু এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানেন মাত্র ৪৩% মানুষ। এর মধ্যে ৪০-৪৫% মানুষই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসী হতে ব্যাথা নাশক ওমিপ্রাজল, এসমিপ্লাজল গ্র্রপের ঔষধ সেবন করেন।
জরিপটিতে ৭৫% মানুষই ব্য থা হতে এন্টাসিড ট্যাবলেট এবং সিরাপ খান নিজেদের পছন্দমত মাত্রায় বা বেশী হলে ফার্মেসীর লোকদের কথামত সেবন করেন।
গ্যাষ্ট্র্রিক কি?
বৈজ্ঞানিকভাবে যে জিনিসটিকে গ্যাস্ট্রিক বলা হয়, সেটির আসল নাম হচ্ছে পেপটিক আলসার ডিজিজ বা পিইউডি। পাকস্থলী, ডিওডেনাম ও ইসোফেগাস-এই তিনটির যেকোনো জায়গায় যদি অ্যাসিডের কারণে ক্ষত হয়, এটাকে বলে পেপটিক আলসার ডিজিজ। এবং যখন বলা হচ্ছে গ্যাস্ট্রিক আছে, তখন বোঝা যাচ্ছে, তার পেপটিক আলসার রয়েছে। এটা পাকস্থলী বা ডিওডেনামে হতে পারে। আলসার হয় পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালের স্তরে। আরো হয় অন্ত্রনালীর এক অংশে যাকে বলা হয় স্মল ইনটেস্টাইন’। পাকস্থলীতে আলসার হলো পেপটিক আলসারের সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ। পাচক রস থেকে পাকস্থলীকে রক্ষায় পাতলা শেষ্মার যে স্তর থাকে, তা হ্রাস পেলে দেখা দেয় আলসার। এর পরিমাণ কমে গেলে পাচক রস পাকস্থলীর দেয়াল খেয়ে ফেলতে থাকে।
সাধারণত দুই ধরনের আলসার দেখা যায়। পাকস্থলী এবং অয়েসোফাগাস আলসার। দু’টোর আবির্ভাব ঘটে সম্পূর্ন ভিন্ন কারণে। অফেসোফাগাস সচারচর দেখা যায় না। এটি হয় বেশি বেশি অ্যালোকোহল সেবনে। অন্যদিকে, এলোমেলো জীবনযাপন এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে দেখা দেয় পাকস্থলীর আলসার। আমাদের দেশে যে কোনো কারণেই পেটের সমস্যা হোক না কেন Seclo/ Losectil/ Maxpro/ Sergel/ Pantonix/ Esotid/ PPI/ Nuprazol/ Probitor ইত্যাদি খাও। আমার মনে হয় পুরো পৃথিবীতে এত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ অন্য কোনো দেশে খাওয়া হয় কিনা সন্দেহ আছে!
আমাদের দেশে ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ যে কারণে অপ্রয়োজনীয় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খায় সেই সমস্যা হচ্ছে: একটু খাবার খেলে পেট ভরা ভরা লাগে, অস্বস্তি লাগে, ক্ষুধা লাগে না। এক বেলা খেলেই মনে হয় ১ সপ্তাহের খাওয়া খেয়ে ফেলেছে। পেট ফুলে যায়। অনেকের তো ঢোল হয়ে যায়। শব্দ করে ঢেকুর হয়। গ্যাস বের হয় মুখ দিয়ে ও পায়ুপথ দিয়ে। অনেকের গ্যাস ওপরের দিকে চাপ দেয়; বুক ধড়ফড় করে ওঠে! এমনকি অনেকের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়!
দুধ কিংবা দুধের তৈরি খাবার (সেমাই, কাস্টার্ড, আইসক্রিম ইত্যাদি), ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার (পরোটা, কেক, শিঙাড়া, পাউরুটি ইত্যাদি) আর মশুরের ডাল খেলে সমস্যা বাড়ে। আসলে ওপরের কোনো লক্ষণই আমাদের ভাষায় প্রচলিত গ্যাস্ট্রিক না। এখানে পেটে গ্যাস তৈরি হয় বেশি। এসব ক্ষেত্রে Omeprazole/ Esomeprazole/ Lansoprazole/ Rabeprazole এর কোনো ভূমিকা নেই।
গ্যাস্ট্রিক সমস্যা কেন হয়?
প্রধানত পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দেয়। অতিরিক্ত অ্যাসিড পাকস্থলীর মিউকোসার পর্দা নষ্ট করে পাকস্থলীর সংস্পর্শে আসে এবং প্রদাহ তৈরি করতে পারে। আর হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়াও মিকোসাল পর্দা নষ্ট করে দেয়। অ্যাসিডকে পাকস্থলীর সংস্পর্শে এসে প্রদাহের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া কারও পৌষ্টিকতন্ত্র থেকে যদি বেশি পরিমাণে অ্যাসিড এবং প্রোটিন পরিপাককারী একধরনের এনজাইম (পেপসিন নামে পরিচিত) নিঃসৃত হতে থাকে, তবে এটি হতে পারে। আবার জন্মগতভাবে কারও পৌষ্টিকতন্ত্রের গঠনগত কাঠামো দুর্বল থাকে, তাহলেও পেপটিক আলসার হতে পারে।
গ্যাস্ট্রিক সমস্যা তে আক্রান্ত ব্যক্তি বা রোগীর বেলায় বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ে খেতে হবে বা ভাজা-পোড়া-তেলজাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না। নন-আলসার ডিসপেপসিয়া, এটাতে গ্যাস হয় বেশি, জ্বালা হয় বেশি, পেট ফুলে থাকে বেশি, সেটাতে ভাজা-পোড়া সাংঘাতিক ক্ষতিকর। তবে যদি এটি আলসার হয়ে থাকে, যেহেতু আলসারের একটি ি কিৎসা রয়েছে এবং অনেক সময় চিকিৎসা ছাড়াও এরা ভালো হয়ে যায়, এ জন্য এখানে অনেক বেশি সমস্যা হয় না। তবে ওই খাবারগুলো লক্ষণকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। যাঁর ব্যথা রয়েছে, তাঁর ব্যথাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। যাঁর জ্বালা রয়েছে, সেটা বাড়িয়ে দিতে পারে। এই বিষয়গুলো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য আজকাল চিকিৎসার বিষয়টি এমন দিকে যাচ্ছে যে ব্যক্তির যা মনে চায় তাই খাবে, চিকিৎসক শুধু ওষুধ দিয়ে ভালো করে দেবে। খাওয়ার সীমাবদ্ধতা ছাড়া চিকিৎসা করতে চাই। আমরা আশা করছি, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এমন চিকিৎসা এসে যাবে, যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে খাবারের বেলায় বাছতে হবে না।
নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী খাবারের কথা বলতে গেলে, রিফ্লাক্স বলে মানুষের শরীরে একটি জিনিস রয়েছে, আমি যদি প্রতিদিন ২টার সময় ভাত খাই, একদিন যদি না খাই সে সময়ে পেট অ্যাসিডে ভর্তি হয়ে যাবে। তবে আমি যদিসেখানে দেরি করে খাই, আমার লক্ষণটা বেড়ে যাবে। এ জন্য নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার উপকার রয়েছে। আমাদের শরীর একটি অভ্যাসের মধ্যে লে যায়। অভ্যাসের ব্যতিক্রম হলেই সমস্যা হয়। তবে ডিওডেনাল আলসার যেটা, সেখানে যদি প্রায় প্রায় খাবার দেওয়া হয়, তাঁদের লক্ষণগুলো কমতে সাহায্য হয়। তবে এখন যেই ি কিৎসা পেপটিক আলসারের রয়েছে, এখানে খাওয়ার বিষয়ে বাছতে হবে না। এর পরও আমরা বলি, আপনার যেটা খেলে অসুবিধা মনে হয়, সেটি এড়িয়ে যান।
কী কারণে পাকস্থলীতে বেশি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে?
অনেক কারণে আলসার দেখা দেয়। ব্যাকটেরিয়া আছে যাকে দেখা যায় পাকস্থলির শেষ্মার স্তরে। এরা স্মল ইনটেস্টাইনেরও থাকে। ব্যথা উপশমে নিয়মিত ওষুধ খেলে বাড়তি ঝুঁকি দেখা যায়। এ সময় ধ‚মপান, অ্যালোকোহল সেবন এবং মসলাদার খাবার খেলে আরো বেশি সমস্যা দানা বাঁধে। পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে প্রদাহ দেখা দেয়।
ব্যথানাশক ওষুধের কারণে বেশি অ্যাসিড তৈরি হতে পারে। অনিদ্রা, অতিরিক্ত টেনশন, বেশি তেলে ভাজাপোড়া খাবার, ধূমপান ইত্যাদিও বাড়তি অ্যাসিড তৈরি করে। আমরা তখনই ফার্মেসী হতে আমাদের পছন্দ মত ওষুধ খাওয়া শুরু করি। ওমিপ্রাজল-জাতীয় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বছরের পর বছর খাওয়া বিপজ্জনক পেটে গ্যাস, বমি ভাব, পেট ফুলে ওঠে বা চিনচিন করে ব্যথা করে এমন সমস্যা হলেই মুঠো মুঠো গ্যাস্ট্রিকের বড়ি খান, অথবা অ্যাসিডিটির সিরাপ খান। তাতে খানিকটা আরাম মেলে অবশ্য, কিন্তু সমস্যা থেকেই যায়। আপনি হয়তো জানেন না, পেটে একধরণের জীবাণু সংক্রমণ এর জন্য দায়ী হতে পারে। হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি নামের এই জীবাণু পাকস্থলী এবং পাকস্থলীর প‚র্ববর্তী অংশ ডিওডেনামে বাসা বাঁধে, দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে, যাকে বলে গ্যাস্ট্রাইটিস। কখনো কখনো পাকস্থলীতে ক্ষত বা আলসার সৃষ্টি করে। পেপটিক আলসার ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্য এই জীবাণুর একটি বিশেষ ভ‚মিকা আছে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর জনসংখ্যার অর্ধেকই এই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত।
সাধারণ কারণ
১. খাবারে অনিয়ম
সঠিক সময়ে খাবার না খেলে পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে প্রদাহ দেখা দেয় যার ফলে ব্যথা অনুভুত হয়।
২. ফাস্ট ফুড বা ভাজা পোঁড়া খাবার
চর্বি এবং ভাজা খাবার পাকস্থলীর ক্ষতি করে, বুক জ্বালাপোড়া এবং এসিড রিফ্লাক্সের কারণ হয়। ভাজা খাবার হজম হওয়া কঠিন তাই পাকস্থলীর ওপর চাপ পড়ে। এদের বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা হয়।
৩. ধূমপান
ধূমপান পাকস্থলীর সমস্যা তৈরি করে। অধিকাংশ লোক বিষয়টি জানলেও অভ্যাসবশত এটিকে ছাড়তে পারে না। ধূমপান পাকস্থলীতে খুব খারাপ প্রভাব ফেলে। এটি পেপটিক আলসার তৈরি করতে পারে। এমনকি কখনো কখনো পাকস্থলীতে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয় ধূমপান।
৪. মদ্যপান
মদ্যপান পাকস্থলীর ক্ষতির কারণ হতে পারে। এটি হজমে সমস্যা তৈরি করে। সামান্য পরিমাণ মদ্যপানও পেটে প্রদাহ তৈরি করতে পারে। এটি বমি, পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া এসিড রিফ্লাক্স এবং বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা তৈরি করে।
৫. বরফ খাওয়া
বরফ খাওয়া পাকস্থলীর সমস্যা করতে পারে। আমরা জানি, ধূমপান, মদ্যপান পাকস্থলীর ক্ষতি করে। তবে বরফ কামড়ে খাওয়ার অভ্যাসে দাঁত, গলা, জিহবা ও পাকস্থলীর ক্ষতি হয়। যাদের বরফপানি খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে তাদের পেটে গ্যাস, পাকস্থলীতে ব্যথা, পেট ফোলাভাবের সমস্যা হতে পারে।
৬. ব্যথানাশক ওষুধ
ব্যথানাশক ওষুধ পাকস্থলীর ক্ষতি করে। কিছু কিছু ব্যথানাশক ওষুধ আছে যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে খেলে পাকস্থলীর ক্ষতি হয়। তাই ব্যথানাশক কম খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
৭. চকোলেট
অনেকে চকোলেট খেতে ভালোবাসেন। এটা শরীরে তেমন কোনো সমস্যা না করলেও এসিড রিফ্লাক্স তৈরি করতে পারে। এসিড রিফ্লাক্স হলে বুকে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়। চকোলেটের মধ্যে থাকা উচ্চ পরিমাণ কোকো, চর্বি এবং ক্যাফেইন এসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা তৈরি করে। এর কারণে কখনো কখনো পেট ফোলাভাব হয় এবং এটি হজমেও সমস্যা করতে পারে।
৮. সাইট্রাস খাবার
আপনি কী জানেন কিছু সাইট্রাস খাবার রয়েছে যেগুলো এসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা তৈরি করে? যেমন : লেবু, কমলা, টমেটো ইত্যাদি। টমেটো আছে এমন সালাদেও এই সমস্যা হতে পারে। এগুলো হজমেও সমস্যা করে। এই খাবারগুলো খেতে চাইলে অবশ্যই ভরা পেটে খান এবং সম্ভব হলে রাতের বেলা এড়িয়ে লুন।
৯. ঝাল জাতীয় খাবার
কিছু লোক আছে যারা ঝাল খাবার খেতে পছন্দ করে। তবে বেশি ঝাল জাতীয় খাবার বুক জ্বালাপোড়া, হজমে সমস্যা এবং পাকস্থলীর সমস্যা তৈরি করে। লাল মরিচ বা সবুজ মরিচ অনেকেই খাবারে ব্যবহার করে। এই খাবার পাকস্থলীর মিউকোসাল লাইনে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর ফলে গ্যাসট্রিটস, এসিড রিফ্লাক্স, গ্যাসট্রিক আলসারের মতো সমস্যা হয়।
১০. কফি
অনেকেই আছে যারা কফি ছাড়া বাঁ তেই পারে না। একে অনেকেই তার বন্ধু হিসেবেই ভাবে। তবে এই কফি পাকস্থলীর জন্য ক্ষতি করতে পারে। কফির মধ্যে রয়েছে তেল এবং ক্যাফেইন। এটি বুক জ্বালাপোড়া, আলসার, ইরিটেবল বাউল সিনড্রম, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
১০. সফট ড্রিংক
এতে সন্দেহ নেই যে সফট ড্রিংক খুব মজাদার খাবার। তবে এর মধ্যে কোনো পুষ্টিগুণ নেই। এটি কেবল পাকস্থলীর সমস্যা তৈরি করে। হাড় দুর্বল করে দেয়, ওজন বাড়ায়, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই পাকস্থলীর সুরক্ষায় সফট ড্রিংক এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
লক্ষণ
আলসার যাদের রয়েছে বা হতে লেছে তারা চোখ-কান খোলা রাখলে লক্ষণগুলো বুঝতে পারবেন। খেয়াল রাখুন-
* আপনার পেটের উপরিভাগে ব্যথা হয়
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি স্পেশালিস্ট ডাঃ নীল সেনগুপ্তের মতে, ‘আলসারের সর্বাধিক কমন লক্ষণ সমূহের একটি হচ্ছে পেটের উপরিভাগে তীব্র ব্যথা।’ তিনি যোগ করেন, ‘ডাইজেস্টিভ ট্র্যাকের উপরিভাগের যেকোনো জায়গায় আলসার ডেভেলপ হতে পারে, কিন্তু আমরা প্রায়ই ভাবি যে এটি পাকস্থলী বা ক্ষুদ্রান্ত্রে হয়ে থাকে, যেখানে আমরা ব্যথা অনুভব করি।’ আলসার জনিত ব্যথা সাধারণত ব্রেস্টবোন এবং বেলি বাটনের মধ্যবর্তী স্থানে হয়ে থাকে। আলসারের কারণে জ্বালাপোড়া, তীব্র ব্যথা ও হালকা ব্যথা অনুভ‚ত হতে পারে। ব্যথার অনুভব প্রথমদিকে হালকা ও মাঝারি হতে পারে, কিন্তু প্রায়ক্ষেত্রে আলসার ডেভেলপের সঙ্গে সঙ্গে তা অধিক মারাত্মক কোনো কিছুতে পরিণত হয়।
* আপনার বমি ভাব হয়
ডা. সেনগুপ্ত বলেন, ‘আলসারের অন্যতম কমন লক্ষণ হচ্ছে বমি ভাব।’ আরএম হেলদি ওয়েবসাইট অনুসারে, ‘আলসার আপনার পাকস্থলীর পাচক রসের কেমিস্ট্রি পরিবর্তন করে, যার ফলে আপনার বমি ভাব হতে পারে, বিশেষ করে সকালে।’ আলসার থাকলে প্রায়ক্ষেত্রে খাবার পরিপাক বেদনাদায়ক হয়, অনেক রোগী বলেন যে তৈলাক্ত ও র্বিযুক্ত খাবার বা জাঙ্কফুড খাওয়া কমিয়ে ফেললে বমি ভাব হ্রাস পায়।
* আপনার বমি হয়
কখনো কখনো বমি ভাব এত তীব্র হয় যে আপনি বমি করে দেন। বারবার বমি হওয়া কোনো মজার অভিজ্ঞতা নয়, এর চিকিৎসাকালীন সময় ইবুপ্রোফেন ও অ্যাসপিরিনের মতো ওষুধ গ্রহণ করবেন না। ডা. সেনগুপ্তের মতে, ‘এসব ওভার-দ্য-কাউন্টার ব্যথার ওষুধ প্রকৃতপক্ষে আপনাকে আলসার ডেভেলপের উচ্চ ঝুঁকিতে রাখবে এবং আপনার বিদ্যমান আলসারকে আরো খারাপ করতে পারে।’
* আপনার বাথরুম ব্যবহারের সময় রক্তপাত হয়
ডা. সেনগুপ্ত বলেন, ‘গ্যাস্ট্রো-ইন্টেস্টাইনাল ট্র্যাক থেকে রক্ত আসা অনেক রকম সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। এ রক্তপাত পেটের উপরিভাগের ব্যথার সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হলে অত্যন্ত সন্দেহজনক ব্যাপার হচ্ছে, এটি আলসারের লক্ষণ হতে পারে।’ অনেক রোগী বমি করার সময় অথবা বাথরুম ব্যবহারের সময় রক্ত লক্ষ্য করে থাকে, কালো মল দেখে তারা বুঝতে পারে যে মলের সঙ্গে রক্ত আসছে। যদি জিআই ট্র্যাক থেকে রক্তপাত হয় এবং সেই সঙ্গে বমি ভাব ও পাকস্থলী বা বুকে ব্যথা হয়, আপনার ডাক্তার আলসার আছে কিনা জানতে ব্লাড টেস্ট বা আপার এন্ডোস্কপি (যেখানে পাকস্থলী পর্যবেক্ষণ করার জন্য ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়) করেন। হেমোরয়েড বা কোলন ক্যানসারের কারণেও মলের সঙ্গে রক্ত বের হতে পারে। তাই প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে ডাক্তার দেখানোই ভালো।
* আপনার অধিকাংশ খাবারে বুকজ্বালা হয়
যা কিছুই খান না কেন, যদি আপনার বারবার বুকজ্বালা হয়, তাহলে এর জন্য আলসার দায়ী হতে পারে। বেশিরভাগ আলসার রোগীরা বলেন যে তারা তীব্র বুকব্যথা অনুভব করেন, যা খাওয়ার পরে স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক ঢেকুর বা হিক্কার কারণ। অনেকক্ষেত্রে গ্যাস ও ব্যথা সাময়িকভাবে উপশম করতে সাধারণ ওভার-দ্য-কাউন্টার এন্টাসিড গ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু এটি দিনের পর দিন লেগে থাকলে বুকজ্বালার চেয়েও বেশি মারাত্মক রূপ ধারণ করবে।
* আপনার পেট স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ফাঁপা
আপনার পেট কি ফাঁপা? এটি সামান্য গ্যাস জমার চেয়েও মারাত্মক কোনো কিছু ইঙ্গিত করতে পারে, যেমন- এটি আলসারের লক্ষণ হতে পারে। আরএম হেলদি অনুসারে, প্রায়ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা হতে পারে আলসারের প্রাথমিক উপসর্গসমূহের একটি, বিশেষ করে সেসব রোগীদের বেলায় যারা মিডসেকশন বা কোমর ব্যথার অভিযোগ জানায়। শরীর সহ্য করে না এমন খাবার খাওয়া অথবা পর্যাপ্ত পানি পান না করাও পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে। পেট ফাঁপার সঙ্গে আলসারের অন্য উপসর্গ দেখলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।
* আপনার খাবার ইচ্ছা কমে গেছে
অনেক আলসার রোগীদের খাবারের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পায় বা ক্ষুধা কমে যায়। ক্ষুধা হ্রাস এবং সেই সঙ্গে মাঝেমাঝে বমি অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের ওজন কমিয়ে ফেলে। কিছু আলসার রোগী বলেন যে, স্বাভাবিক পরিমাণে আহার সত্ত্বেও তাদের ওজন হ্রাস পেয়েছে। তাই বলা যায়, আলসার নিজেই ওজন কমাতে পারে।
* আপনার অস্বাভাবিক ক্ষুধা লাগে
যদিও আলসার ক্ষুধা হ্রাস করে, কিন্তু সাধারণত খাওয়ার তিন/চার ঘন্টা পর নাভি ও বুকের মধ্যবর্তী স্থানে ব্যথাকে কখনো কখনো ক্ষুধা মনে করে ভুল হয়। খাবার খেলে ব্যথা চলে যায়, যদি এটি পাকস্থলীর আলসারের কারণে হয়। কিন্তু ভোজনে নিম্নস্থ ক্ষুদ্রান্তের আলসারের ব্যথা দূর হয় না।
* আপনার পিঠ ব্যথা হয়
পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্তে আলসার হতে পারে, কিন্তু আলসারের ব্যথা পিঠেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট শিল্পা রাভেলা ওমেন’স হেলথকে বলেন, ‘যদি আলসার অন্ত্রের প্রাচীর ভেদ করে, ব্যথা অধিক তীব্র ও অধিক সময় ধরে হতে পারে এবং উপশম করা কঠিন হতে পারে।’
* আপনার বেশি ঢেকুর ওঠে
আলসারের সর্বাধিক কমন লক্ষণসম‚হের একটি হচ্ছে, বদহজম এবং এ কারণে আপনার ঢেকুর ওঠতে পারে। যদি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঢেকুর তোলেন এবং এ প্রতিবেদেনে উল্লেখিত উপসর্গের যেকোনো একটি লক্ষ্য করেন, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাটি কোন পর্যায়ে আছে, এটি বোঝার উপায় কি?
শুরুতেই ডাক্তাররা সাধারনত কোনো পরীক্ষায় যায় না। শুধু লক্ষণ দেখে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। যেমন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ রেনিডিটিন দিতে পারে। ওমিপ্রাজল দিতে পারে। আর জীবনযাপনের ধরণ ঠিকমতো পালন করতে বলি তাহলে সমস্যাগুলো কমে যায়। তারপরও যদি দেখা যায় সমস্যা লতে থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই এন্ডোস্কোপি করতে হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগী প্রথম এলেই এন্ডোস্কোপি করতে হয়। যেমন দেখা যায়, খুব বেশি ব্যথা বা ডাক্তাররা হাত দিয়ে যদি কোনো কিছু অনুভব করে। যদি দেখা যায় যে খুব মারাত্মক পেটে ব্যথা থাকছে, সেক্ষেত্রে শুরুতেই এন্ডোস্কোপি করতে বলে। এন্ডোস্কোপির সঙ্গে আলট্রাসনোগ্রাফিও করা হয়, গলব্লাডারে পাথর আছে কি না দেখার জন্য। অনেক সময় এটিও ছাড়াও কেউ কেউ এন্ডোস্কোপি করতে অনেক ভয় পায়। এন্ডোস্কোপি করাবে চিকিৎসক-অনেকে এই ভয়েও ডাক্তারের কাছে আসে না। এটি ছাড়াও একটি পরীক্ষা আছে। একে বলা হয়, ইউরিয়া ব্রেথ টেস্ট। এটি আগে আমাদের দেশে হতো না। এখন অনেক হাসপাতালেই এই পরীক্ষা হচ্ছে। এই পরীক্ষায় সুবিধা হলো কিছু ওষুধপত্র বন্ধ করতে হয়। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাস্ট্রিকের কিছু ওষুধ বন্ধ রাখতে হবে। এটা নন-ইনভেসিভ। কোনো কিছু মুখের ভেতর ঢোকানো হবে না। শুধু কার্বন খাওয়ানো হবে এবং আধা ঘণ্টা পর নিশ্বাসের একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। দুটো পরীক্ষারই উদ্দেশ্য একটি যে পেটে কোনো জীবাণু আছে কি না দেখা। একটি ব্যাকটেরিয়া আছে-হেলিকোব্যাকটোপাইলোরি। এটা খুব প্রচলিত। তবে সবার ক্ষেত্রে এটা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা করে না। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে করে। তবে যদি পরীক্ষা করে এটি পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এই চিকিৎসার পর অনেক রোগীই কিন্তু ভালো হয়ে যায়।
তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে প্রথমেই এন্ডোস্কোপি করা হয়। তবে রেনিটিডিন, ওমিপ্রাজল এগুলো আবিষ্কারের পর গ্যাস্ট্রিক আলসারের পরিমাণ অনেক কমেছে। এরপরও কিছু কিছু গ্যাস্ট্রিক আলসারের রোগী পাওয়া যায়। তবে এগুলো কিন্তু ভালো নয়। সে ক্ষেত্রে হতে পারে এটা আলসার। অথবা সে কখনো গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খায়নি। অথবা এগুলো ক্যানসারের দিকে টার্ন নেয়। সেগুলোর ক্ষেত্রে এন্ডোস্কোপি করা ছাড়া বিকল্প নেই।
প্রতিরোধ
পেপটিক আলসার ডিজিজ বা গ্যাস্ট্রিক আলসার জটিল কোনো রোগ নয়। ডাক্তারি পরামর্শ মোতাবেক ওষুধ সেবন ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে সহজেই এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া স ¢ব। লুন, এই রোগ থেকে প্রতিকারের সহজ কিছু উপায় জেনে নিই
১. ভাজাপোড়া ও মসলাযুক্ত খাবার কম খাওয়া।
২. ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ বর্জন করা।
৩. ক্যাফেইনযুক্ত খাবার এড়িয়ে লা।
৪. অ্যাসপিরিন ও ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলা। এইওষুধগুলোর কারণে আলসারের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।
৫. ভিটামিন এ, সি ও ই-যুক্ত ফলমূল ও শাকসবজি বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করা। এই ভিটামিনগুলো আলসারের ঘা শুকাতে সাহায্য করে।
৬. ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কোমলপানীয় এড়িয়ে লা।
৭ প্রয়োজনমাফিক বিশুদ্ধ পানি পান করা।
৮. সময়মতো খাওয়ার অভ্যাস করা।
চিকিৎসা
পেপটিক আলসারের রোগীরা সাধারণত অ্যান্টাসিড এবং এজাতীয় ওষুধ সেবনে উপকৃত হন। জীবাণুজনিত কারণে যদি এ রোগ হয়ে থাকে, তবে বিভিন্ন ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ সেবনের পরও যদি রোগী ভালো না হন, কিছু খেলে যদি বমি হয়ে যায় অর্থাৎ পৌষ্টিক নালির কোনো অংশ যদি সরু হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে রোগী উপকৃত হতে পারেন।
সময়মতো চিকিৎসা না করালে
পাকস্থলী ফুটো হয়ে যেতে পারে।
রক্তবমি হতে পারে।
কালো পায়খানা হতে পারে।
রক্তশূন্যতা হতে পারে।
ক্যানসারও হতে পারে (কদাচিৎ)।
পৌষ্টিক নালির পথ সরু হওয়া এবং রোগীর বারবার বমি হতে পারে।
যা যা খাবেন নাঃ
১) ডাল ও ডাল জাতীয় খাবার, বুট, ছোলা, বীন, সয়াবিন ইত্যাদি ধরণের খাবার গ্যাস উদ্রেককারী খাবার। এগুলোতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, সুগার ও ফাইবার যা সহজে হজম হতে চায় না। ফলে গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি করে পেটে।
২) ব্রকলি, পাতাকপি, বাঁধাকপি এইধরনের সবজিগুলোতে রয়েছে ‘রাফিনোজ’ নামক একধরণের সুগার উপাদান যা পাকস্থলীর ব্যাকটেরিয়া ফারমেন্ট না করা পর্যন্ত হয় না। এবং এই অবস্থায় পেটে গ্যাসের সমস্যা বৃদ্ধি পায়।
৩) দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারঃ দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পর যদি দেখেন পেটে গ্যাস হচ্ছে তার অর্থ হচ্ছে আপনি লাক্টোজ ইন্টলারেন্ট অর্থাৎ আপনার দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার হজমে সমস্যা রয়েছে। হজম হয় না বলেই এগুলো আপনার পেটে গ্যাস উদ্রেকের জন্য দায়ী।
৪) আপেল ও পেয়ারাঃ আপেল ও পেয়ারাতে রয়েছে ফাইবার এবং ফ্রুক্টোজ ও সরবিটোল নামক সুগার উপাদান যা সহজে হজম হতে চায় না। এতে করেও গ্যাস হয় পেটে।
৫) লবণাক্ত খাবারঃ লবণের সোডিয়াম অনেক বেশি পানিগ্রাহী। অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার খেলে দেহে পানি জমার সমস্যা দেখা দেয়। পাকস্থলীতেও সমস্যা শুরু হয় ও খাবার হজম হতে চায় না।
যা যা খাবেনঃ
১) শসা : শসা পেট ঠান্ডা রাখতে অনেক বেশি কার্যকরী খাদ্য। এতে রয়েছে ফ্লেভানয়েড ও অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান যা পেটে গ্যাসের উদ্রেক কমায়।
২) দই: দই আমাদের হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এতে করে দ্রæত খাবার হজম হয়, ফলে পেটে গ্যাস হওয়ার ঝামেলা দূর হয়।
৩) পেঁপে : পেঁপেতে রয়েছে পাপায়া নামক এনজাইম যা হজমশক্তি বাড়ায়। নিয়মিত পেঁপে খাওয়ার অভ্যাস করলেও গ্যাসের সমস্যা কমে।
৪) কলা ও কমলা : কলা ও কমলা পাকস্থলীর অতিরিক্ত সোডিয়াম দূর করতে সহায়তা করে। এতে করে গ্যাসের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়াও কলার স্যলুবল ফাইবারের কারণে কলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ক্ষমতা রাখে।
৫) আদা : আদা সবচাইতে কার্যকরী অ্যান্টি- ইনফ্লেমেটরি উপাদান সমৃদ্ধ খাবার। পেট ফাঁপা এবং পেটে গ্যাস হলে আদা কুচি করে লবণ দিয়ে কাঁচা খান, দেখবেন গ্যাসের সমস্যা সমাধান হবে।
৬. ঠান্ডা দুধ : পাকস্থলির গ্যাসট্রিক এসিডকে নিয়ন্ত্রণ করে অ্যাসিডিটি থেকে মুক্তি দেয় ঠান্ডা দুধ। এক গ্লাস ঠান্ডা দুধ পান করলে অ্যাসিডিটি দূরে থাকে।
৭. দারুচিনি : হজমের জন্য খুবই ভালো। এক গ্লাস পানিতে আধ চামচ দারুচিনির গুঁড়ো দিয়ে ফুটিয়ে দিনে ২ থেকে ৩ বার খেলে গ্যাস দূরে থাকবে।
৮. জিরা : জিরা পেটের গ্যাস, বমি, পায়খানা, রক্তবিকার প্রভৃতিতে অত্যন্ত ফলপ্রদ। জ্বর হলে ৫০ গ্রাম জিরা আখের গুড়ের মধ্যে ভালো করে মিশিয়ে ১০ গ্রাম করে পাঁ টি বড়ি তৈরি করতে হবে। দিনে তিনবার এর একটি করে বড়ি খেলে ঘাম দিয়ে জ্বর সেরে যাবে।
৯. লবঙ্গ : ২/৩টি লবঙ্গ মুখে দিয়ে ুষলে একদিকে বুক জ্বালা, বমিবমিভাব, গ্যাস দ‚র হয়। সঙ্গে মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়।
১০. এলাচ : লবঙ্গের মতো এলাচ গুঁড়ো খেলে অম্বল দূরে থাকে।
১১. পুদিনা পাতার পানি : এক কাপ পানিতে ৫টা পুদিনা পাতা দিয়ে ফুটিয়ে খান। পেট ফাঁপা, বমিভাব দূরে রাখতে এর বিকল্প নেই।
১২. মৌরির পানি : মৌরি ভিজিয়ে সেই পানি খেলে গ্যাস থাকে না। এ ছাড়াও খাবারে সরষে যোগ করুন। সরষে গ্যাস সারাতে করতে সাহায্য করে। বিভিন্ন খাবারের সাথে সরষে যোগ করা হয় যাতে সেইসব খাবার পেটে গ্যাস সৃষ্টি করতে না পারে। নজর রাখতে হবে নিজের খাওয়া-দাওয়ার প্রতি। জেনে নিতে হবে কোনটি খাওয়া উচিত হবে কোনটি হবে না।
পরিশেষে :
যারা প্রয়োজন ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন তাদের ভবিষ্যতে আয়রন, ভিটামিন, ম্যাগনেসিয়ামের অভাব দেখা দেবে। এমনকি হাড় ক্ষয়, অল্প আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা সেই সঙ্গে শরীরে কিছু রোগজীবাণু প্রবেশের সক্ষমতা বেড়ে যাবে। এমনকি কিডনিতে মারাত্মক সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নিজের রোগ সম্পর্কে জানুন। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন। প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ খাওয়া পরিহার করুন। ওমিপ্রাজল-জাতীয় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ বছরের পর বছর খাওয়া বিপজ্জনক। এতে পাকস্থলীর পিএইচ পরিবর্তিত হয়ে যায়, ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। যদি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা লেগেই থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
* খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন ও খাওয়ার সময় স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখুন। হাত ধোয়ার গুরুত্ব শিখুন। জীবাণুটি সাধারণত পানিবাহিত।
* ধূমপান বর্জন করুন। কফি না খাওয়াই ভালো। ট করে ব্যথার ওষুধ খাবেন না। এগুলো পেপটিক আলসারের সমস্যা বাড়ায়।
* গ্যাস্ট্রিকের সাধারণ উপসর্গ পাকস্থলীর ক্যানসারেরও উপসর্গ। তাই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই ভালো।
পেট ফাঁপা, অরুি , পেটব্যথা, বমি ভাব, গলা জ্বলা ইত্যাদি সাধারণউপসর্গছাড়াওহেলিকোব্যাকটারপাইলোরিসংক্রমণের জন্য পাকস্থলীতে ক্ষত হয়ে বমি বা মলের সঙ্গে রক্তপাত, ইত্যাদিও হতে পারে। জীবাণুর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য রক্তে অ্যান্টিবডি দেখা হয়, নিশ্বাসের ইউরিয়া ব্রেথ টেস্ট করা হয়, কখনো এনডোস্কোপি করে টিস্যু নিয়ে তাতে জীবাণু পাওয়া যায়। কয়েক ধরনের ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকের মিশেল বেশ কিছুদিন ব্যবহার করার পর জীবাণু নির্মূল হয়, তবে আবারও হতে পারে। এই জীবাণু দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিকের বিপরীতে রেসিসট্যান্স তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে নির্মূল করা কঠিন। এখন পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে কোনো টিকা কার্যকর নয়। তাই সতর্কতাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা।




.jpg)

.jpg)






