×

দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগ : এক নীরব ঘাতক

ডা. আসিফ ইয়াজদানী ০১:৪২ মিঃ, অক্টোবর ৯, ২০১৮ Views : 2583

বর্তমানে আমাদের দেশে ক্রনিক কিডনী ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে। প্রায় সব পরিবারের কোন না কোন সদস্য এই রোগে আক্রান্ত। তাই এই মরণঘাতী রোগ সম্পর্কে আমাদের সকলের সচেতন হওয়া উচিত।

দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগ বলতে কিডনী ধীরে ধীরে (কয়েক মাস বা বছর ধরে) অকেজো হওয়া বা এর কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়াকে বুঝায়। মানবদেহে প্রতিটি বৃক্কে রয়েছে প্রায় ১মিলিয়নের মত নেফ্রন, যা বৃক্কের গাঠনিক ও কার্যকর একক। যদি কোন নেফ্রন ক্ষতি গ্রস্থ হয়, তবে সেটি স্বাভাবিক কাজ করতে পারেনা। তখন অন্যান্য সুস্থ নেফ্রন গুলো স্বাভাবিক কার্যাবলী ঠিক রাখার জন্য অতিরিক্ত কাজ করে। এভাবে আরো অনেক নেফ্রন নষ্ট হয় অতিরিক্ত কাজ করতে করতে এবং এই সংখ্যা বাড়তেই থাকে। শেষ পর্যন্ত আর পর্যাপ্ত কার্যকরী নেফ্রন থাকেনা, ফলে বৃক্ক অকেজো হয়ে পড়ে।

শরীরের রক্ত থেকে কিডনী ফিল্টার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্য এবং অতিরিক্ত পানি প্রস্রাবের সাথে বের করে দেয়। কিডনী অকেজো হলে শরীরে বিষাক্ত পদার্থ জমতে থাকে ফলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। কিডনী গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরী করে যা শরীরের অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, শরীরে রক্ত তৈরি করা। কিডনী আমাদের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং ইলেক্ট্রোলাইট (ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম) এর পরিমান ও নিয়ন্ত্রন করে ।

কিডনী রোগের লক্ষণঃ

কিডনী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথম দিকে কোন সমস্যা বুঝতে পারেন না। কারন প্রাথমিক পর্যায়ে কোন লক্ষন প্রতীয়মান হয় না। ধীরে ধীরে বিভিন্ন রকমের শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই এই রোগকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কিডনী রোগে যে সমস্ত উপসর্গগুলো দেখা যায় সেগুলো হলঃ

● ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতে

● বমি বমি ভাব

● ক্লান্তি এবং দূর্বলতা

● চোখের চারপাশ, পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া

● শ্বাসকষ্ট

● প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া

● ক্ষুধামন্দা

● রক্তশূণ্যতা

● অনিদ্রা

● ত্বকফাটা ও চুল্কানি

● মানসিক ভারসাম্য হ্রাস

দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগের কয়েকটি কারন বা ঝুঁকিসম্পন্ন ফ্যাক্টরগুলো হলঃ

● ডায়াবেটিস

● উচ্চ রক্তচাপ

● কিডনীর প্রদাহ বা গোমেরুলোনেফ্রাইটিস, যা কিডনীর ছাঁকনি পর্দাকে ক্ষত-বিক্ষত করে

● ঔষধঃ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ভাবে কিছু ঔষধ ; যেমনঃ ব্যথার বড়ি হিসেবে Non-steroidal Anti-inflammatory Drugs (NSAIDs), হার্টের জন্য ACEI গ্রুপের ঔষধ সেবন ইত্যাদি।

● জন্মগত কিডনী রোগ

● লুপাস এবং অন্যান্য অটোইমিউন রোগ (auto-immune diseases) যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্ষতি গ্রস্থ করে।

● ইউরিনারি সিস্টেমে কোন প্রতিবন্ধকতা জনিত কারণ, যেমনঃ বৃক্কে পাথর , টিউমার বা অর্বুদ, পুরুষের প্রস্টেট গ্রন্থির বড় হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

● ঘন ঘন মূত্র সংক্রমণ বা (Urinary Tract Infection)

● রক্তে অতিরিক্ত চর্বি জমা

● ধূমপান

● স্থূলতা

● পরিবারে কারো কিডনী রোগ থাকলে

● বৃদ্ধ বয়স

জটিলতাঃ

ক্রনিক কিডনী রোগ আপনার শরীরের প্রায় প্রতিটি অংশকে আক্রান্ত করতে পারে। সচরাচর যে জটিলতা গুলো দেখা দেয়:

● শরীরে পানি জমে যাওয়া। বিশেষ করে চোখের নিচের অংশে, পায়ের পাতায় প্রাথমিকভাবে পানি জমে ফুলে যায়। ধীরে ধীরে সারা শরীরে এই পানি ছড়িয়ে যেতে পারে। তাছাড়া শরীরের ভিতরের অর্গান বিশেষত ফুসফুসে ও হার্টে পানি জমে যায় এবং শ্বাসকষ্ট হয়।

● রক্তে হাইপারক্যালেমিয়া বা পটাসিয়ামের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় যা আপনার হার্টের ক্ষতি করতে পারে। এটি কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া বা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন করে যা জীবন-হুমকির কারণ হতে পারে।

● হাড় ক্ষয় বা অস্টিওপরোসিস

● রক্তশূণ্যতা

● শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস

রোগ নির্ণয়ঃ

কিডনী রোগ নির্ণয়ের জন্য আপনাকে কিছু পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হতে পারে, যেমন:

● রক্ত পরীক্ষা ও কিডনী ফাংশন পরীক্ষাঃ ক্রিয়েটিনিন, ইউরিয়া, ই-জি.এফ.আর. (eGFR) এর পরিমান

● প্রস্রাব পরীক্ষা, বিশেষ করে প্র¯্রাবে প্রোটিনের পরিমান

● পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি

দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগকে ৫টি ধাপে ভাগ করা হয়। এই ধাপগুলো করা হয় কিডনীর ফিলট্রেশন বা রক্ত ছাঁকন প্রক্রিয়ার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে, যাকে বলে গ্লোমেরুলার ফিলট্রেশন রেট বা জি.এফ.আর ( Glomerular filtration rate or G.F.R.)। মানব দেহে সুস্থ অবস্থায় কিডনীর জি.এফ.আর. হলঃ ১২৫ মিলি/মিনিট/১.৭৩ বর্গমিটার দেহের পৃষ্ঠ এলাকা। তবে কারো জি.এফ.আর. কমপক্ষে ৬০ মিলি/মিনিট এর

উপরে থাকলে, কিডনী রোগের অন্যান্য আনুষাঙ্গিক উপসর্গ না থাকলে এবং কিডনীর আকার ও গঠন স্বাভাবিক থাকলে সাধারনত তাকে কিডনী রোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কিডনীর কার্যক্ষমতা যত হ্রাস পায়, কিডনী রোগের ধাপ ততো উপরে উঠতে থাকে। চতুর্থ বা পঞ্চম ধাপে যাওয়া মানে কিডনীর জি.এফ.আর. ৩০ মিলি/মিনিট এর কম এবং এ অবস্থা থেকে কিডনীর সুস্থ অবস্থায় ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে রোগীকে ডায়ালাইসিস বা কৃত্রিম উপায়ে দেহের রক্তের বর্জ্য অপসারণের শরণাপন্ন হতে হয়।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসাঃ

কিডনী একবার নষ্ট হলে তা পুরোপুরি সুস্থ অবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। তাই এই রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানা খুবই জরুরী। সচেতন হলে স্বল্প ব্যয়ে প্রাথ মিক পর্যায়ে কিডনী রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধ করা সম্ভব।

●কিডনী রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন প্রতিরোধযোগ্য বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হোন। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী কিডনী রোগে ভুগে থাকে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে

২০ থেকে ৪০ শতাংশ রোগীর কিডনী অকেজো হয়ে পড়ে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে

রাখলে কিডনীকে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

● ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে ব্যথার বড়ি হিসেবে অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি ঔষধ সেবনে সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

● নিয়মিত ব্যায়াম করুন, ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখুন, পরিমিত আহার করুন। কিডনী রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ খাদ্য তালিকা মেনে চলা উচিত।

● ধূমপান বর্জন করুন।

● নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃংখল জীবন যাপন করুন।

● শিশুদের ক্ষেত্রে টনসিলাইটিস, প্রস্রাবে প্রদাহ ও চর্মরোগের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করান।

● কিডনী যখন সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায় তখন ডায়ালাইসিস (Dialysis) অথবা কিডনী সংযোজন (Renal Transplant) হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। দু’টো কিডনী ৯০ শতাংশ অকেজো হওয়ার পরই ডায়ালাইসিস বা কিডনী ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রয়োজন হয়।

যে সকল খাবার গ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ :

কিডনী রোগীকে ডাক্তারের পরামর্শ মত রেনাল ডায়েট মেনে চলতে হয়। এই রোগে যে সকল খাবার গ্রহণে সচেতনতা অবলম্বন করা দরকার সেগুলো হলঃ

● বিস্কুট

● কেক, মাফিন

● চকোলেট

● ওটমিল

● সিরিয়াল

● অ্যাভোকাডো

● ঢেঁড়স

● আলু

● পুঁই শাক

● টমেটো

● কামরাংগা

● অ্যাপরিকোট

● কমলা

● কলা

● আমলকি

● মাখন, পনির

● নারিকেল

● গরুর মাংস

● প্রক্রিয়াজাতকরন খাবার বা প্যাকেটজাত খাবার

● সস বা কেচাপ

● ফাস্ট ফুড

কিডনী নষ্ট হলে ডায়ালাইসিস করে চিকিৎসা করার সামর্থ্য খুব কম মানুষের-ই আছে। কিডনী একবার নষ্ট হলে তা কখনো পুরোপুরি ভালো হয় না। তাই এর প্রতিরোধের চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিডনী রোগ চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হল কিডনীকে আরো ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা। বাংলাদেশে যে হারে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী ২০২০ সালে প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনী রোগে আক্রান্ত হবে বলে জরিপে জানা গেছে। জেনে রাখা দরকার, প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার রোগী কিডনী অকেজো হওয়ার কারনে অকালে মৃত্যুবরণ করে। তাই আমাদের কিডনী রোগ সম্পর্কে জানা এবং এর প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে

তোলা সময়ের দাবী।