×

রক্তপরীক্ষা

সংবাদ প্রতিনিধি ০৯:১৭ মিঃ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৯ Views : 1248

রক্তপরীক্ষা রোগ নির্ণয়ের জন্য একটা ভাল হাতিয়ার। শরীরের রক্ত হল নানান ধরনের কোষের সমষ্টি, আর অন্যান্য যৌগিক বস্তু, যেমন-বিভিন্ন ধরনের লবণ, প্রোটিন, ইত্যাদিও থাকে। এগুলির প্রত্যেকটিরই প্রয়োজনীয়তা আছে, এবং এদের সল্পতা বা আধিক্য সমস্যা নির্দেশ করে। রক্তের তরল অংশকে বলা হয় প্লাজমা। যখন শরীরের বাইরে রক্ত জমে যায়, তখন রক্তের কোষগুলি এবং কিছু কিছু প্রোটিন শক্ত হয়ে যায়। তখন সেটাকে বলা হয় সিরাম। এই সিরামও নানা পরীক্ষায় ব্যবহার করা হয়। নানান ভাবে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। কতটা রক্ত লাগবে বা তার কোন অংশ লাগবে- সেটা নির্ভর করছে কী পরীক্ষা তা দিয়ে করা হবে তার উপরে। ডায়াবেটিস রোগীদের রক্ত-শর্করা মাপার জন্য কয়েক ফোঁটা রক্ত আঙুলের ডগায় ছুঁচ ফুটিয়ে নিলেই যথেষ্ট। আবার সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষার জন্য বেশ কিছুটা রক্তের প্রয়োজন হয়- যা সাধারণত হাতের কনুইয়ের সামনের ভাঁজের শিরা থেকে নেওয়া হয়। সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা থেকে রক্তের বিভিন্ন সেল বা কণিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এই পরীক্ষার ফলাফল থেকে যার রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা করা যায়। তার কোনো রোগ হয়ে থাকলে বা কোন উপসর্গ থাকলে সেগুলির কারণ কী- তা বহুক্ষেত্রেই বের করা যায়।

আমাদের রক্তে নানান রকমের কণিকা থাকে, যেমন- শ্বেতকণিকা, লোহিতকণিকা ও প্ল্যাটিলেট। এদের প্রত্যেকেই আমাদের দেহকে সুস্থ রাখতে নানাভাবে সাহায্য করে। সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষায় সাধারণত তাদের সম্পর্কে এই তথ্যগুলি থাকে:

  • রক্তে শ্বেতকণিকার সংখ্যা: শ্বেতকণিকা আমাদের শরীরকে অসুখ বিসখের হাত থেকে রক্ষা করে। যদি দেহে কোন রোগের সংক্রমণ হয়, তাহলে দেহের শ্বেতকণিকা সেই সংক্রমণের জন্য দায়ী জীবাণু, ভাইরাস ইত্যাদিকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে। আকৃতিতে শ্বেতকণিকা লোহিতকণিকার থেকে বড় হয় এবং সংখ্যাতে তারা কম হয়। দেহে যদি কোন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হয়, তাহলে শ্বেতকণিকার সংখ্যা খুব বেড়ে যায়। শ্বেতকণিকার সংখ্যা থেকে সংক্রমণের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সময় বিশেষে এগুলি অন্যান্য তথ্যও চিকিৎসককে দেয়। যেমন, ক্যান্সারের চিকিৎসার সময়ে এর সংখ্যা থেকে চিকিৎসার কার্যকারিতা আঁচ করা যায়।
  • শ্বেতকণিকার রকমভেদ: বিভিন্ন ধরনের শ্বেতকণিকা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। এদের মধ্যে নিউট্রোফিল, লিস্ফোসাইট, মনোসাইট, ইয়োসিনোফিল হল প্রধান। অপরিণত নিউট্রোফিল, যাকে ব্যান্ড নিউট্রোফিল বলা হয়, সেগুলোকেও পরীক্ষার সময়ে গোনা হয়। শরীর রক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শ্বেতকণিকার বিভিন্ন ভূমিকা আছে। তাই এদের সংখ্যাগুলি শরীরের প্রতিরোধ-ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়। বিভিন্ন শ্বেতকণিকার কমা বা বাড়ার উপর নির্ভর্ করে কী জাতীয় সংক্রমণ, এটি অ্যালার্জি বা টক্সিন-জনিত প্রতিক্রিয়া না লিউকেমিয়া ইত্যাদি।
  • রক্তে লোহিতকণিকার সংখ্যা:  রক্তে লোহিতকণিকার কাজ হল ফুসফুস থেকে অক্সিজেন বহন করে শরীরের সমস্ত জায়গায় পৌঁছে দেওয়া এবং সেখান থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করে ফুসফুসে নিয়ে আসা, যাতে করে ফুসফুস সেগুলো দেহ থেকে বের করে দিতে পারে।

লোহিতকণিকার সংখ্যা কম হওয়া অ্যানেমিয়ার লক্ষণ, এর অর্থ শরীর প্রয়োজনমত অক্সিজেন পাচ্ছে না। লোহিতকণিকার সংখ্যা যদি বেশি বেড়ে যায়, তাহলে ভয় থাকে সেগুলি একসঙ্গে জমাট বেঁধে উপশিরাগুলির ভেতরকার পথ বন্ধ করে দিতে পারে।

  • হেমাটোক্রিট: লোহিতকণিকা রক্তের কতটা অংশ জুড়ে আছে সেটি বোঝাতে এটি ব্যবহার করা হয়। এটি মাপা হয় শতাংশ বা পার্সেন্টেজ হিসেবে। যদি হেমাট্রোক্রিট ৪০ বলা হয়, তার মানে রক্তের ঘনায়তনের একশো ভাগের ৪০ ভাগ লোহিতকণিকা পূর্ণ।
  • হিমোগ্লোবিন: লোহিতকণিকার একটি প্রয়োজনীয় অংশ হল হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনই অক্সিজেনকে বহন করে এবং লোহিতকণিকার রক্তবর্ণের জন্য দায়ী। পরীক্ষায় হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ সাধারণভাবে নির্দেশ করে দেহ কতটা অক্সিজেন পাচ্ছে।
  • লোহিতকণিকা নির্দেশিকা: লোহিতকণিকার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়ার জন্য তিন রকম নির্দেশিকা ব্যবহার করা হয়। গড় কণিকার ঘনায়তন, গড় কণিকাকার হিমোগ্লোবিন এবং গড় কণিকাকার হিমোগ্লোবিনের গাঢ়ীকরণ। এগুলি একটি যন্ত্রের সাহায্যে এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষণ থেকে মাপা হয়। এ থেকে একটা লোহিতকণিকায় হিমোগ্লোবিন কতটা ঘনীভূত অবস্থায় রয়েছে তা জানা যায়। এই তথ্যগুলি থেকে কী ধরনের অ্যানিমিয়াতে লোকে ভুগছে সেটা বোঝা যায়। লোহিতকণিকাগুলির আয়তন সব এক হয় না, কম বেশি থাকে। সেটি দেখানোর জন্য অনেক সময় লোহিতকণিকার ব্যাপ্তি বণ্টন এর উল্লেখও রিপোর্টে থাকে।
  • প্লাটিলেট বা থ্রম্বোসাইট এর সংখ্যা: এগুলি হল রক্তের ক্ষুদ্রতম কণিকা। রক্ত জমাট বাঁধার ব্যাপারে এগুলির মস্ত ভূমিকা আছে।যখন কেটে রক্ত ঝরতে থাকে, তখন এই প্লাটিলেট আকারে বৃদ্ধি পেয়ে একসঙ্গে বৃদ্ধি পেয়ে একসঙ্গে জমাট বেঁধে একটা আঠার মত পদার্থে পরিণত হয়। সেটাই কাটা জায়গায় আটকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। রক্তে প্লাটিলেট খুব কম থাকলে এবং কোন কারণে রক্তক্ষরণ শুরু হলে প্লাটিলেটের অভাবে সেই রক্তপাত বন্ধ হতে চায় না। আবার যদি খুব বেশি প্লাটিলেট থাকে, তাহলে দেহের রক্তবাহী নালীগুলিতে জমে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
  • রক্ত লেপন পরীক্ষা: এতে এক ফোঁটা রক্ত কাচের স্লাইডে ফেলে সেটিকে আরেকটা স্লাইড দিয়ে ঘষে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তারপর এক ধরণের বিশেষ রঙ ‍দিয়ে সেটিকে রঞ্জিত করা হয়। মাইক্রোস্কোপ ‍দিয়ে এই রঞ্জিত স্লাইড পরীক্ষা করলে রক্তকণিকার অস্বাভাবিক গঠন, আয়তন ইত্যাদি ধরা পড়ে। তা থেকে ম্যালেরিয়া সিকেল সেল অ্যানিমিয়া ইত্যাদি নানা রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।