×

স্তন ক্যান্সার :জানতে হবে

ডাঃ শায়লা আজিজ ০৫:২৬ মিঃ, অক্টোবর ১০, ২০১৮ Views : 1079

আমাদের দেশের রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই গোপন রাখার প্রবণতা দেখা যায় । স্তন ক্যান্সার তেমনই একটি বিষয় । বিশেষত আমাদের দেশে নারীরা স্তন বিষয়ক যে কোন সমস্যাই এড়িয়ে যান অথবা এ বিষয়ে কারো সাথে পরামর্শ করতে চান না । এমতাবস্থায় সার্বিক চিন্তা ভাবনার যেমন পরিবর্তন দরকার তেমনি নিজেও সচেতন হওয়া জরুরী । স্তন ক্যান্সার বিষয়ক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা থাকলে ক্যান্সারের খারাপ পর্যায়ে যাওয়ার আগেই রোগ শনাক্তকরণ এবং নির্মূল সম্ভব ।

আলোকপাত :

ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার বিবেচনায় ত্বকের ক্যান্সারের পরই স্তন ক্যান্সারের অবস্থান । মনে রাখতে হবে শুধু নারী নয়, পুরুষ ও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে । আগে এ রোগে মৃত্যুর হার বেশি থাকলেও এখন তা অনেকটাই কমে এসেছে । এর মূলে রয়েছে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্তকরণ । একটি সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে প্রায় ২,৫২,১৭০ জন নতুন রোগী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে । এমতাবস্থায় নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রাথমিক কিছু বিষয় সবারই জানা থাকা দরকার ।

উপসর্গঃ

স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে নিজে নিজে নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করা যাকে বলা হয় BSE (Breast Self Examination). নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো দেখা দিলে দেরী না করে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে।

● স্তনে গোটা অনুভূত হওয়া বা শরীরের আশেপাশে  জায়গার তুলনায় স্তন বেশি শক্ত মনে হওয়া

● স্তনের আকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাওয়া

● স্তনের চামড়ার পরিবর্তন হওয়া বা চামড়া ভিতরে ঢুকে যাওয়া

● স্তনের বোঁটা ভিতরের দিকে ঢুকে যাওয়া

● স্তনের বোঁটার চারদিকের কালো জায়গার পরিবর্তন লক্ষ্য করা

● স্তনের চামড়া লাল হয়ে যাওয়া বা কমলার খোসার মত হয়ে যাওয়া

স্তন ক্যান্সারের কারণঃ

আমাদের স্তনের দুটি অংশ থাকে- গ্রন্থি এবং গ্রন্থিনালী। ক্যান্সার এ দুটি অংশের যে কোনটিতে শুরু হতে পারে। ক্যান্সার আবার দুই ধরণের হয়- বিনাইন (Benign) ও ম্যালিগনেন্ট (Malignant) . বিনাইন ক্যান্সার সাধারণত স্তনের ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকে । অন্যদিকে ম্যালিগনেন্ট ক্যান্সার আমাদের রক্তনালী (blood vessel) এবং লসিকানালীর (lymph vessels) মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে যা  মারাত্মক । সাধারণত হরমোন, জীবনযাত্রার ধরণ এবং কিছু পরিবেশগত উপাদান স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তবে এসব ঝুঁকির উপস্থিতি ছাড়াও স্তন ক্যান্সার হতে পারে  যার কারণ জানা যায়নি । ৫-১০% স্তন ক্যান্সার বংশগত কারণে হয়ে থাকে । বিশেষত যদি কারো মা, বোন বা মেয়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে । BRCA1 এবং BRCA2 এ দুটি জীন উপস্থিত থাকলে স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেড়ে যায় ।

আরো কিছু বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকলে স্তন ক্যান্সার হতে পারে তবে এমন নয় যে এগুলো থাকলে স্তন ক্যান্সার হবেই

● মহিলারা পুরুষের চেয়ে স্তন ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হয় ।

● বয়স বৃদ্ধি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি করে ।

● কারো যদি স্তনের টিস্যু পরীক্ষা করে কোন অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায় তবে তার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । আবার এক স্তনে ক্যান্সার হলে আরেক স্তনে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায় ।

● রেডিয়েশন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় ।

● স্থূলতা ক্যান্সারের অন্যতম নিয়ামক ।

● কম বয়সে রজঃপাত শুরু (১২ বছরের আগে) অথবা বেশি বয়সে রজঃনিবৃত্তি (৪৫ বছরের পরে) হওয়া।

● আজকাল সবাই বেশি বয়সে সন্তান নিতে চান । এটাও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় ।

● যে কখনও গর্ভবতী হয়নি তার স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে ।

● রজঃনিবৃত্তির পর হরমোন থেরাপী নেওয়া বা অ্যালকোহল পান করাও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয় ।

● কিভাবে প্রতিরোধ সম্ভব স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিগুলো জানলেই তা অনেকখানি প্রতিরোধ করা সম্ভব । যাদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো আছে তারা সাধারণ কয়েকটি নিয়ম জানলেই স্তন ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে পারেন । সবচেয়ে দরকারি হল জীবনযাত্রার ধরণ পরিবর্তন

● নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করতে হবে । বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করতে হবে। ব্রেস্ট স্ক্রিনিং এর জন্য শারীরিক পরীক্ষা, ম্যামোগ্রাম ইত্যাদি টেস্ট করাতে হবে । তবে সবক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।

● নিজে নিজেই স্তন বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং BSE এর সাথে সুপরিচিত হতে হবে । স্তনে কোন রকম পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে ।

● অ্যালকোহল, ধূমপান পরিহার করতে হবে ।

● প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করতে হবে । প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়ামের জন্য ব্যয় করতে হবে

● রজঃনিবৃত্তির পরে হরমোন থেরাপী নিলে তা উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি করবে কি না তা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে । দরকার হলে ওষুধের ডোজ কমিয়ে থেরাপী নিতে হবে ।

● ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে । নিয়মিত ব্যায়ামের সাথে সাথে সুষম খাবার খেতে হবে ।

● স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে । অলিভ অয়েল, বাদাম, শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মটরশুটি ইত্যাদি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় ।

● যাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে তারা চিকিৎসকের পরামর্শ সাপেক্ষে ঔষধ (Preventive Medication) গ্রহণ করতে পারেন ।

পরিশেষঃ

স্তন ক্যান্সার বিষয়ে অজ্ঞতা এবং কুসংস্কারই রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ । একমাত্র যথাযথ জ্ঞান এবং পরিপূর্ণ ব্যক্তিগত যত্নই পারে এ রোগের ঝুঁকি কমাতে ।